বুড়ি বসন্ত উল্লাস মল্লিক সবাই জানতাম, ভোলার বড়মামার দোনলা বন্দুক আছে। পেল্লাই ভারী বন্দুক। দুটো নল দিয়ে তার লাল-নীল আগুন ছোটে। এত হেব্বি ভারী, ভোলার বড়মামা ছাড়া কেউ তুলতেই পারে না। যারাই চেষ্টা করেছে কোমর ভেঙে পড়ে গিয়েছে। এঁচোড় বিল্টু অবশ্য ফুট কেটেছিল এ তো সেই হরধনু ভঙ্গর কেস; কেউ চাগাতেই পারে না, রাম চাগিয়ে সীতাকে বিয়ে করল। পাড়ায় বিল্টুর নাম এঁচোড় বিল্টু এমনি হয়নি; এই সব পাকামির জন্যেই হয়েছে। তাই খুব একটা পাত্তা পায়নি ও। ভোলার বড়মামার দোনলা বন্দুক স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছে আমাদের কাছে। তা সেবার মামার বাড়ি থেকে ফিরে এক আশ্চর্য রোমহর্ষক কাহিনি শোনাল ভোলা। বড়মামা তার শিকারে গিয়েছে, কাঁধে সেই বন্দুক, ঘন জঙ্গল, দিনেরবেলাতেও ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, ঝিঁঝিঁ ডাকছে, হঠাৎ মামার সামনে ডবল যমরাজ। কী, কী? আমরা নিশ্বাস চেপে একসঙ্গে বলে উঠি। মাত্র ক’হাত দূরে একটা বাঘ আর একটা সিংহ। বড়মামাকে লক্ষ করে দু’জনেই একসঙ্গে লাফ দিল। চক্ষের পলকে বড়মামা বন্দুক বাগিয়ে গুড়ুম, গুড়ুম! এঁচোড় বিল্টু এ বারেও ফ্যাঁকড়া তুলল গুল দিচ্ছিস, একসঙ্গে বাঘ-সিংহ থাকতেই পারে না। ভোলা ভেংচে উঠল তুই কী করে জানবি; তোর বড়মামার তো কোমরে বাত, লাঠি নিয়ে হাঁটে, আমার মামার মাস্ল দেখেছিস, বাঁটুল দ্য গ্রেট-এর মতো গুল্লু গুল্লু। এঁচোড় বিল্টু দমে যায় একটু। চাক্ষুষ প্রমাণ এখানে সরাসরি তার বিরুদ্ধে। মামার বাড়িতেই থাকে সে। সবাই দেখেছি বিল্টুর বড়মামা লাঠি নিয়ে হাঁটে, কাশির দমকে রগের শিরা ফুলে ওঠে কেঁচোর মতো। ভোলার বড়মামাকে কেউ দেখিনি, তাই বেনিফিট অব ডাউট তার ফেভারে। সমস্বরে খেঁকিয়ে উঠি আমরা তোর ভাল না লাগে তুই চলে যা বিল্টু; ভোলা তুই বল, তার পর কী হল? তার পর আর কী হবে! ভোলা খুব হেলাফেলার সঙ্গে বলে, বড়মামা বাঘের মুণ্ডু আর সিংহের ল্যাজটা ঘচাং করে কেটে বাড়ি নিয়ে এল। মামার বাড়ির বৈঠকখানায় এখনও টাঙানো আছে, তোরা কোনও দিন গেলে দেখাব। আমাদের চোখের সামনে তখন ভোলার বড়মামা ভেসে ওঠে। বিপুল চেহারা, তাগড়াই গোঁফ, খাঁকি ইউনিফর্ম আর হাঁটু পর্যন্ত গামবুট পরে বনজঙ্গল ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে বাঘ-সিংহের সন্ধানে। পিঠে দোনলা বন্দুক, তার নল মাথা ছাড়িয়ে উঠতে উঠতে সোজা আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। দীপঙ্করের মামা অবশ্য শিকার-টিকার করত না। মুম্বইয়ে থাকত। বছরে এক বার বাড়িতে আসত। দূর থেকে দেখেছি, রোগা, কালো, লম্বাটে ভাঙাচোরা মুখে সরু গোঁফ। কিন্তু ওই নিপাট সাদামাটা লোকটাই নাকি অমিতাভ বচ্চনের বন্ধু। একই পাড়ায় থাকে। রোজ সকালে কুকুর নিয়ে মর্নিং-ওয়াক করে একসঙ্গে। সুখ-দুঃখের গল্পও হয়। বচ্চন নাকি দীপঙ্করের মামার বাড়ি আসার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছে বহু বার; যে কোনও দিনই চলে আসতে পারে। দীপঙ্কর তখন আমাদের নিয়ে যাবে। তবে একটাই শর্ত পাঁচকান করা যাবে না কথাটা; কারণ বচ্চন সাহেব ভিড়ভাট্টা একদম পছন্দ করেন না। পরে জেনেছি, ভোলার বড় মামার পোলিয়ো, দুটো পা-ই বাঁকা, বন্দুক তোলা দূরস্থান হাঁটাচলাই করতে পারে না ভাল করে। আর দীপঙ্করের মামা মুম্বই তো ছার, এ দিকে ব্যান্ডেল আর ও দিকে বাউড়িয়া ছাড়িয়ে কোথাও যায়নি কোনও দিন। কিন্তু সেই ছবিগুলো সেই যেগুলো ওরা মামার বাড়ি থেকে ফিরে আঁকত আমাদের সামনে, বন্দুক কাঁধে বীর শিকারি ভোলার বড়মামা, কিংবা অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে খোশগল্পরত দীপঙ্করের মামা, সে সব ছবি, আজও, সব ক’টা রং ঠিকঠাক নিয়ে, এখনও দগদগ করে মনের মধ্যে।মামার বাড়িগুলো সব আমাদের এক একটা আশ্চর্য ড্রিমল্যান্ড, এক সব পেয়েছির দেশ, এক উপুড়হস্ত ভালবাসার ভাণ্ডার, যেখানে গেলেই দেখতে পাওয়া যায় ওস্তাদ ওস্তাদ সব বাজিগরদের। তাই মামার বাড়ি যাব শুনলেই ভেতরে কোথাও একটা বসন-তুবড়ি আলোর ফোয়ারা তুলত; আগের দিন রাতে ঘুম আসতে চাইত না কিছুতেই। অনেক রাত পর্যন্ত এ পাশ ও পাশ করতে করতে টের পেতাম বোনও জেগে। মা অবশ্য ঘুমিয়ে পড়ত তাড়াতাড়ি পরের দিন সকাল সকাল উঠতে হবে যে, গোছগাছ করে নিতে হবে সব কিছু। জানি, পরের ক’দিন মা একদম অন্য মা। সকালে খেঁকিয়ে তুলছে না ঘুম থেকে, দুপুরে চাপড়ে ঘুম পাড়াচ্ছে না, তুলকালাম বাধাচ্ছে না ঠা-ঠা রোদে কাঠি বরফ চুষলে। পুকুরে চান করতে নেমে যত ইচ্ছে হুড়োহুড়ি করছি, সারা দুপুর আগানবাগানে টো টো ঘুরছি, বাড়ি ফিরছি সন্ধে উতরে গেলে। মা বড় জোর মাঝে মাঝে ধমক দিয়ে বলছে, তোরা কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস...! কিন্তু সেই ধমকে কামড় কোথায়? শীতের সকালে রোদ পোহাতে পোহাতে কুকুর বাচ্চা দলছুট হয় যখন, মা-কুকুর এমন নরম করে কামড়ে তুলে নিয়ে আসে তাকে। এ কামড়ে দাঁত বসে না। মা নিজেই তো কেমন রুটিনছুট। যখন তখন বেরিয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে, দীপু মামাদের বাড়ি গল্প করতে করতে সন্ধে পার করে দিচ্ছে, বর্ষা মাসির সঙ্গে দোকানে যাচ্ছে সেজেগুজে। মেজমামা আমার কেজো মানুষ। এই বাজার যাচ্ছে, তার পরেই মুনিষদের কাজের তদারকিতে মাঠে। কুড়ুল দিয়ে মস্ত কাঠের গুঁড়ি চ্যালা করে কেটে ফেলছে দেখতে দেখতে। প্রত্যেক বারই বলে, বাবা পিকলু, কত বড় হয়ে গেছিস রে! মেজমামার সঙ্গে মাঠে যেতাম। দেখতাম গোল হয়ে বসে জলপানি করছে মুনিষরা। তরকারি মাখা মুড়ি; গোটা কাঁচা লঙ্কা চিবিয়ে খেত। তারা আমাকে দাদাবাবু বলত। বলত, দাদাবাবু, এলে কবে...? ছোট মামা অবশ্য খুব একটা পাত্তা দিত না। নিজের সাইকেলের যত্ন ছিল খুব। শ্যাম্পু করা চুল কায়দা করে আঁচড়াত। টেরিকটের জামা পরত প্যান্টে গুঁজে। মুখে সব সময় গুনগুনে গান। শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল আমার। ম্যায় শায়র তো নেহি...। দাদু কিংবা বড় মামাকে দেখলে থেমে যেত চট করে। দুপুরের দিকে হুট করে কোথাও একটা চলে যেত। যেতে চাইলে বলত, বড় হ, নিয়ে যাব। আমি বলতাম, কোথায় যাও; কী আছে সেখানে? ভারী রহস্যময় হাসত ছোটমামা। মেদুর চোখে ঘাড় নেড়ে নেড়ে বলল, হরিদাসের বুলবুল ভাজা...। সেটা আবার কী? হুঁ হুঁ, বাবা; টাটকা তাজা খেতে মজা। তার পরেই সেই পরিচিত সুর ম্যায়, শায়র তো নেহি...। চিরাচরিত খাবার ঝামেলা মামার বাড়িতে ভ্যানিশ। আমি, বোন, তুতাই, পাতাই, তমাল সবাই কাঙালি ভোজনের মতো লাইন দিয়ে খেতে বসি। কম্পিটিশনের খাওয়া। তুতাই এক্সট্রা ভাত নিলে আমাকেও নিতে হবে। বোন, যে কিনা বাড়িতে তরিতরকারিকে বিষবৎ জ্ঞান করে, যে জন্যে মায়ের রেগুলার দাঁত খিঁচুনি বাঁধা, সেও তমালের দেখাদেখি এই অ্যাতটা কুমড়োর ছক্কা নিয়ে নিল। মা অবাক হয়ে শুধু বলে, ওহ্, কী শয়তান ছেলেমেয়ে রে বাবা। বাড়িতে চল, দেখাচ্ছি মজা। মায়ের বিস্ময় আবার প্রবলতর, যখন ভরপেট খেয়ে উঠে দিদার সঙ্গে ফের দু’গাল খেতাম। ডাল, তরকারি মাখা ভাতের মণ্ড দিদা মুখে তুলে দিলে শালিক পাখির বাচ্চার মতো কপ করে গিলে নিতাম। কী যে অপূর্ব খেতে! সাদামাটা ডাল-ভাত, তবু কী আশ্চর্য স্বাদ! তেমন স্বাদ তো আর কোনও দিন কোনও সুখাদ্যে পেলাম না। সেই কোন ছেলেবেলাতেই অমৃত ভক্ষণ হয়ে গিয়েছিল আমার। মেজমামার অবশ্য একটা ব্যাখ্যা ছিল দিদা তো সারা দিন রান্না করে, তেল ঝাল মিষ্টি লেগে থাকে হাতে, তাই দিদার মাখা ভাতে এত টেস্ট। দাদু কিন্তু মানবে না কিছুতেই। রোজ খেতে বসে কত অভিযোগ ডালে নুন কম, তরকারিতে মিষ্টি বেশি, ভাত কী শক্ত, যেন চাল...। দিদা আড়ালে অভিযোগ করত মায়ের কাছে জানিস মান্তু, তোর বাবার বয়েস যত বাড়ছে তত খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে, দিনরাত শুধু টিকটিক...।টিকটিক করুক আর যা-ই করুক, দাদু গল্প বলত হেব্বি। রাক্ষস-খোক্কস, ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী, পক্ষীরাজ ঘোড়া সবই তো জ্যান্ত দেখতে পেতাম। শুধু ‘বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি’ শুনে একটু হোঁচট খেয়েছিল মনটা। বিচিটা কি ফল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল বাইরে, না কি পাক দিয়ে সবটাই ঢোকানো ছিল ভেতরে এই তর্কটাই চলত মনের মধ্যে। ছোটমামার একটা ঘুনধরা ক্রিকেট ব্যাট ছিল সিঁড়ির নীচে, আর আড়াইখানা উইকেট। যদিও খেলতে দেখিনি কোনও দিন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি ব্যাটসম্যান না বোলার গো, মামা? ছোটমামা ভুরু নাচিয়ে বলেছিল, আই অ্যাম অলরাউন্ডার; ম্যায় শায়র তো নেহি...! বন্ধুদের সে রকমই বলেছিলাম। অলরাউন্ডার। কপিলের চেয়েও বলে জোর বেশি; ছ’বলে ছ’টা ছক্কা মারে যখন-তখন। এঁচোড়ে বিল্টু বলেছিল ফালতু গুল দিবি না কিন্তু। গুল কী, দেখবি ছোটমামা ক’দিন পরেই ইন্ডিয়ার হয়ে খেলবে, ইডেনে খেলা পড়লে ফ্রি পাস দেবে, তখন চাইলে কচু পাবি তুই, এই এখন বলে রাখলাম। বড়মামাকে একটু এড়িয়ে চলতাম। বড়মামার মস্ত গোঁফ, ভারী চশমা, মোটামোটা বই। রোজ সকালে অফিস যায়, সন্ধেবেলা ফেরে। খুব গমগমে গলায় মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, কোন ক্লাসে উঠলি রে পিকলে; রইবার বই নিয়ে বসবি তো আমার কাছে। মামার বাড়ি অশান্তি বলতে এইটুকুই। যদিও কোনও রবিবারই মামার মনে থাকত না, সকাল হলেই ছিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ত মাছ ধরতে। কিন্তু সপ্তাহভর চোরা একটা টেনশন থেকেই যেত মনের মধ্যে। এক রবিবার বৃষ্টি হল খুব। সে-দিন আবার বড়মামার ঘুসঘুসে জ্বর। যা ভয় করেছিলাম তাই হল। বড়মামা বলল, আয় পিকলে তোকে পড়া ধরি। বল তো ওয়ান ডে আই মেট আ লেম ম্যান মানে কী? আমি ভেবেচিন্তে সবে বলতে শুরু করেছি এক দিন আমি একটি...। মাঝ পথে থামিয়ে দিল মামা। উঁহু, হচ্ছে না, হচ্ছে না! ওয়ান ডে আই মেট আ লেম ম্যান, মানে বাবা কখনও আপনার হয় না; ইন আ লেন, মানে যদিও বা হয়; ক্লোজ টু মাই ফার্ম, মানে দু’এক দিনের জন্যে। সে দিন থেকে ব্যস, বড়মামার সঙ্গে ব্যাপাক দোস্তি। এবং মামার বাড়ি সেন্ট পারসেন্ট নিষ্কণ্টক। বন্ধুদের কাছে বড়মামা হয়ে গেল পুলিশ অফিসার। বন্দুক, রিভলবার, ভজালি, কামান, নানচাকু সব চালায়। দেখলাম, পুলিশের ভাগ্না হিসেবে বাড়তি খাতির পাচ্ছি। অমিত আলুকাবলি থেকে অনেকটা দিয়ে দিল, মন্টুর প্রাণের ধন বাইনোকুলারটা আমার হাতে অনেকক্ষণ ছেড়ে রাখল। এঁচোড়ে বিল্টু কেবল স্মরণ শক্তির পরিচয় দিল। বলল, তবে যে বলেছিলি তোর বড়মামা রেলে চাকরি করে? করেই তো। আমি জোর গলায় বললাম, সেখানে ভাল কাজ করেছে, তাই প্রধানমন্ত্রী বড় মামাকে পুলিশ অফিসার করে দিয়েছে। আচম্বিতেই এক দিন হরিদাসের বুলবুল ভাজা চাক্ষুষ করলাম। ছোটমামার সাইকেলে চেপে বাজারে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় ছোটমামা বলল, চল এক জায়গায় যাই। সাদামাটা একটা এক তলা বাড়ির সামনে এসে বেল দিল মামা। ফ্রক পরা একটা মেয়ে দরজা খুলল। কোঁকড়ানো চুল, ফর্সা রং, গোলাপি ফ্রকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল তাকে। বলল, এটা নিশ্চয়ই পিকলু? এই সুন্দর মেয়েটা আমার নাম জানে! একটু খুশি-খুশি লজ্জা লাগল আমার। মেয়েটার ভীষণ রোগা আর ফ্যাকাসে চেহারার মা ছোটমামাকে চা দিল আর আমাকে বিস্কুট, আমসত্ত্ব। চা খেতে খেতে ছোটমামা বলল, পিকলু, তুই একটু আশপাশটা ঘুরে দেখ। আশপাশে অবশ্য দেখার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। কয়েকটা আম আর নারকেল গাছ, এঁদো ডোবা, নেড়ি কুকুর দুটো আর একটা হাড় জিরজিরে বেড়াল। এ সবের চেয়ে ওই গোলাপি মেয়েটা বেশি করে টানছিল আমায়। ফেরার সময় মেয়েটা আমার গাল টিপে আদর করে দিল। ছোট মামা বলল, আসছি তা হলে বুলবুলি। সাইকেল চালাতে চালাতে মামা বলল, বাড়িতে কাউকে কিছু বলবি না, বুঝলি! তখন বোঝার মতো বয়েস হয়নি; তবুও যেন ব্যাপারটা বুঝলাম। বললাম, আচ্ছা। তার পর গান ধরল ছোটমামা ম্যায় শায়র তো নেহি...! গান আমি কোনও দিনই খুব একটা বুঝি না; তবু সে দিন মনে হয়েছিল ছোটমামার গলায় সুর আছে। মামার বাড়ির মেয়াদ শেষ হলে ফেরার সময়টা বড় যন্ত্রণাময়। সকালে উঠেই মনে হত এই যাঃ, আজই তো শেষ, বিকেলেই চলে যেতে হবে! চুপচাপ ব্যাগ-বাক্স গুছিয়ে নিচ্ছে মা। বিকেলটা আসতও যেন টাট্টু ঘোড়ার মতো টগবগ করতে করতে। বার বার এক টুকরো মেঘের আশায় আকাশের দিকে তাকাতাম। হে ভগবান, প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হোক, পৃথিবী ভেসে যাক, অথবা ভূমিকম্প বা মহাপ্রলয় গোছের কিছু একটা! একটা দাঙ্গা-হাঙ্গামাও কী লাগতে নেই? ঈশ্বর কদাচিৎ কর্ণপাত করতেন। বেশির ভাগ দিন আবহাওয়া থাকত ভারী অনুকূল; দাঙ্গাপ্রবণ লোকগুলো সেই দিনগুলোতেই কেমন আশ্চর্য শান্তশিষ্ট হয়ে যেত। দু’বার মাত্র মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন ঈশ্বর। এক বার ঝড়বৃষ্টির জন্যে আর এক বার মায়ের পা মচকে মুলতুবি ছিল বাড়ি ফেরা। সে যে কী আনন্দ! অদ্যাবধি কোনও অপ্রত্যাশিত অর্থাগম, কোনও সুন্দরী রমণীসঙ্গ, সত্যি বলছি; তার অর্ধেক আনন্দও দিতে পারেনি আমায়। আত্মহারা হয়ে পাঁইপাঁই দৌড়ালাম, উচ্চিংড়ের মতো তিড়িং বিড়িং লাফালাম, ডিগবাজি খেলাম হুটপাট করে। বোনও বারান্দায় শুরু করে দিল এক্কা-দোক্কা খেলা। কিন্তু সে তো নেহাতই দৈবাৎ ঘটনা দু’বার মাত্র ঘটেছিল ইহজীবনে। না হলে দুপুর গড়াতে না গড়াতেই শম্ভুমামা অভ্রান্ত ভাবে প্যাঁক-প্যাঁক করে রিকশা নিয়ে হাজির হবে। দিদা গালে প্রলম্বিত চুমু খেয়ে বলবে আবার কবে আসবি? মাইমা বলবে নারকোল নাড়ুটা নিয়েছ তো ঠিক, ছোটদি? রিকশা শেষ বাঁক নেওয়ার আগে মা এক বার ছলছলে চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাবে। দেখাদেখি আমিও। সবাই তখনও দাঁড়িয়ে। তমাল, তুতাই হাত নাড়ছে। চোখ মুছছে দিদা। মামার বাড়ি যাওয়ার সময় মা এক বারই কাঁদতে কাঁদতে গিয়েছিল। সে বার ছোটমামা আর পলাশদা এল হঠাৎ। আমি বন্ধুদের দেখালাম ওই দেখ পলাশদা, ভুতো মামার ছেলে, হেব্বি বুড়ি বসন্ত খেলে, বুড়িকে যতই গার্ড দিয়ে রাখ, কখন ঠিক সুট করে উঠে যাবে। ছোটমামা যেন এ বার একটু গম্ভীর। বাবার সঙ্গে চাপা গলায় কী সব আলোচনা করল। দাদুর নাকি স্ট্রোক হয়েছে। সেবারই প্রথম আগাম প্রস্তুতি ছাড়াই মামার বাড়ি গেলাম। যেতে যেতে মা চোখ মুছছিল। মামার বাড়ির মোড়টা বেঁকতেই দেখলাম বাড়ির সামনে প্রচুর লোক। কারা সব বাঁশ কেটে দড়ি দিয়ে বাঁধছে। দেখেই ডুকরে উঠল মা। তার পর অনেক দিন মামার বাড়ি যাইনি। এর মধ্যে দিদা এসে কিছু দিন থেকে গেল আমাদের বাড়ি। দিদার কপালে সেই লাল টিপটা নেই, শাড়িটা পরেছে একদম সাদা, দেখেই কেমন ধাক্কা খেলাম। আরও বড় ধাক্কা মামার বাড়ি গিয়ে। অনেক দিন পর পুজোর আগে গেলাম সেবার। দেখি, উঠোনের এক দিকে নতুন একটা রান্নাঘর; বড়মাইমা রান্না করছে। বড়মামার ঘরে গদি আঁটা সোফা, নতুন টিভি, চকচকে ফ্রিজ। বড়মাইমা যেন একটু বেশি চুপচাপ। একটা গাট্টাগোট্টা লোমওলা কুকুরও দেখলাম। তুতাই বলল, বিলিতি কুকুর, ওর নাম ভুলি; সাবান মেখে চান করে, মাংস দিয়ে ভাত খায়। তুতাই আমাদের সঙ্গে খেল না এ বার। ওদের রান্নাঘরে একা খেল। খেয়েদেয়ে মৌরি চিবচ্ছিল; আমাকে দুটো দিয়ে বলল, ওরা নাকি সেপারেট। সেই প্রথম শুনলাম শব্দটা। তখন বুঝিনি, কত মর্মান্তিক ওই শব্দ। মামার বাড়িটা ঠিক জমল না সে বার। কেন জমল না, কে জানে! খেলতে খেলতে একটু সন্ধে হলেই বড়মাইমা ডেকে নিচ্ছিল তুতাইকে। তুতাইও দেখলাম, আমাদের চেয়ে ভুলির সঙ্গে খেলতে বেশি পছন্দ করছে। বুঝতে পারলাম না, সেপারেট হলে মানুষ বদলে যায়, না মানুষ বদলে গেলে সেপারেট হয়। তাই সব রাগটা গিয়ে পড়ল ভুলির ওপর। বাড়ি ফিরে একদম চেপে গেলাম সব কিছু। এ দিকে চাঁদুর মামা নাকি পাইলট হয়েছে। ওর মামার প্লেনে চেপেই তাবড় তাবড় ফিল্মস্টার, ক্রিকেটার মায় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এ দিক ও দিক যায়। সৌরভ জিজ্ঞেস করল, পিকলু তোর ছোটমামার ইন্ডিয়া টিমে ঢোকার ব্যাপারটা কী হল? আমি বললাম, ডেকেছিল তো মামাকে; মামা যাবে না বলে দিয়েছে। দাদু নেই, দাদুর বিজনেস কে দেখবে? যুক্তিটা কত দূর বিশ্বাসযোগ্য হল কে জানে; এঁচোড়ে বিল্টু দেখলাম মিটমিট করে হাসছে। তার পর দিন সন্ধে হয় হয় সময়ে খেলার শেষে গোল হয়ে বসে গল্প করছি মাঠে, চাঁদু বলল, ওর পাইলট মামা ডালকুত্তা পুষছে। সে নাকি সাংঘাতিক কুকুর গায়ে সিংহের মতো জোর; হরিণের মতো দৌড়য়; দরকার হলে গাছে পর্যন্ত উঠে পড়ে। সবাই দেখলাম, খুব মন দিয়ে শুনছে চাঁদুর কথা। আর থাকতে পারলাম না। বললাম, আমার বড়মামাও ভুলি নামে একটা কুকুর পুষেছে। সিংহের মতো তার সত্যি সত্যি কেশর আছে, ডাক শুনেই কত চোর-ডাকাত অজ্ঞান হয়ে যায়। আর স্পিড? কী বলব! এক বার বড়মামা রাত পাহারায় বেরিয়েছে; সঙ্গে ভুলি। অনেক দূরে একটা ডাকাতকে দেখে গুলি ছুড়ল। তার পর লেলিয়ে দিল ভুলিকেও। তার পর কী বলব; ভুলির সঙ্গে গুলির রেস! এই হয়তো গুলিটা এগিয়ে গেল; তার পরেই দেখা গেল ভুলি বিট করে দিয়েছে গুলিকে। ওহ্, কী সাংঘাতিক রেস। কখনও ভুলি কখনও গুলি, কখনও গুলি কখনও ভুলি... চাঁদুর সব ক’টা মুগ্ধ শ্রোতাকে মুহূর্তে টেনে নিলাম আমি। সৌরভ বলল, কে জিতল শেষ পর্যন্ত? এঁচোড়ে বিল্টু বলল, ভ্যাট, গুল দিচ্ছিস। কাকে জেতাব তখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে, বুঝতে পারছিলাম, ভুলির ওপর রাগ অনেকটা কমে গিয়েছে। এ দিকে সন্ধে হয়ে গিয়েছে; মা ডাকছে চিৎকার করে; আমি আর দেরি করলাম না; রেসটাকে অসমাপ্ত রেখেই বাড়ির দিকে দৌড়লাম। এঁচোড়ে বিল্টু পেছন থেকে চিৎকার করল, সব বাজে, সব গুল! বড় হচ্ছিলাম একটু একটু করে। মামার বাড়ি যাওয়াও কমছিল। দিদাও চলে গেল এক দিন। মামার বাড়িতে এখন তিন মাইমার তিনটে রান্নাঘর। বুলবুলি অবশ্য ছোট মাইমা হয়নি। ছোট মাইমা অন্য এক জন। তাকে দেখলে কেন কী জানি, সেই ঝুমকো চুলের গোলাপি ফ্রক পরা ফর্সা মেয়েটার ছবি দেখতে পাই। ভেতরে কে যেন গুনগুনিয়ে গান গায়। খুব পরিচিত সুরে। বড় হতে হতে এত বড় হয়ে গেলাম যে, মামার বাড়ি যাওয়া হারিয়ে গেল এক দিন। সবাই বড় হয়েছি আমরা। এঁচোড়ে বিল্টুও। বিল্টু বিয়ে করেছে, ছেলেপুলেও হয়েছে। তারা এখন মামার বাড়ি যায়। ফিরে এসে নিশ্চয়ই মামার বাড়ির গল্প বলে। বিল্টু বিশ্বাস করে কী? ও তো বড় অভাগা; ওর বেতো বড়মামা ওকে দিয়ে চানের জল তোলাত, ইস্কুল কামাই করলে দাদু কান মুলে দিত, বাজারের হিসেবে গণ্ডগোল করলে, চিৎকার করে গালিগালাজ করত দিদিমা। ও কী করে বুঝবে, মামার বাড়ি কাকে বলে। মামার বাড়ি এক আশ্চর্য দেশ, যেখানে বারো হাত কাঁকুড়ের দিব্যি তেরো হাত করে বিচি হয়, যেখানে কেদারচন্দ্র বোস ইংরেজি হু ডোর মুন সিট ডাউন, যেখানে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে হরিদাসের বুলবুল ভাজা, রাস্তায় রাস্তায় টানা থাকে এক্কা দোক্কার ঘর, সন্ধে হয়ে গেলেও চাঁদের আলোয় দিব্যি ইচিং-বিচিং খেলা যায় এই দেশে...। এ হল এক চির বুড়ি বসন্তের দেশ।