কাল রাত্রে খুব উত্তেজিত হয়ে টেলিফোন করেছিল মউলি, ‘খুব জরুরি, কাল আসতে পারবে?’
কী হয়েছে রে?’
এসে শুনবে। আমি কোন যুগে বাস করছি, বুঝতে পারছি না, তুমি বুঝিয়ে দেবে।
মউলি আমার বন্ধু পরমব্রতর মেয়ে। ওর মা আরতি স্কুলে পড়ায়। পরমব্রত এক জন উঁচু পদের সরকারি চাকুরে ওদের একমাত্র মেয়ে মউলি কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি নিয়ে বছরে চাকরি শুরু করেছে। খুব ভাল মাইনে। অতএব পর দিন গেলাম ওদের বাড়িতে।
আমাকে দেখে আরতি গম্ভীর হল, ‘আসুন। নিশ্চয়ই মেয়ে টেলিফোন করেছিল। প্লিজ, ওকে বোঝান। শোনার পর আমার ঘুম চলে গিয়েছে।
সোফায় বসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সমস্যাটা কী?’
এই সময় পরমব্রত ঘরে এল, ‘এসেছিস। শোন, আমাদের ভরদ্বাজ গোত্র। দিকে মউলি যে ছেলেটিকে পছন্দ করেছে, তারাও একই গোত্র।
আরতি বলল, ‘হ্যাঁ, মানছি অর্ণব ভাল ছেলে, ভাল চাকরি করে। কিন্তু, একই গোত্রে কখনও বিয়ে হতে পারে না। ঠিক কি না, বলুন?’
পরমব্রত বলল, ‘এই নিয়ে প্রবল অশান্তি হচ্ছে বাড়িতে। যুগযুগান্ত ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা যা মেনে এলেন, তার পিছনে কোনও লজিক নেই?’
মউলি এসে দাঁড়াল দরজায়, ‘ রকম বোকা কথা কখনও শুনেছ, সমরেশকাকু?’
পরমব্রত রেগে গেল, ‘কাকে বোকামি বলছ? আমরা হিন্দু, আমাদের—’
হাত তুলে বাবাকে থামিয়ে দিল মেয়ে।দাঁড়াও, দাঁড়াও। তুমি হঠাহিন্দু হয়ে গেলে কী করে? অদ্ভুত তো!’
আরতি ঘাবড়ে গেল, ‘তার মানে?’

মা, তোমাদের টাইটেল চ্যাটার্জি বলেই তোমরা হিন্দু হতে পার না। জ্ঞান হওয়ার পর আমি একটি দিনের জন্যে তোমাদের হিন্দু ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে দেখিনি। বাবার নাকি পৈতে হয়েছিল। আমি কখনও দেখিনি। এই ফ্ল্যাটে ঠাকুরঘর দূরের কথা, কোনও দেবতার ছবি নেই। শাঁখটাক বাজে না। পুজোর সময় তোমরা আগেই প্ল্যান করে রাখো বেড়াতে যাওয়ার। কালীপুজোর সময় জানলা বন্ধ রাখো, শব্দে কান ঝাঁ ঝাঁ করে বলে। কলকাতায় থাকলে পুজোর ছুটি মানে অবধারিত পার্টি হবে। তা হলে নিজেকে হিন্দু বলতে অসুবিধে হচ্ছে না?’ মউলি মাথা নাড়ল, ‘প্লিজ বাবা, হিপোক্রিট হয়ো না। হিন্দু না হয়েও আমরা ভাল আছি।

যা মুখে আসছে, তা- বলছ! হ্যাঁ, পুজো-আচ্চায় আমরা নেই বটে, পৈতে, বিয়ে অথবা শ্রাদ্ধের সময় আমরা হিন্দু মতেই কাজ করি। তখন গোত্রের প্রয়োজন হয়। পুরোহিতমশাই জানতে চান গোত্র কী।বলল পরমব্রত।

বার মউলি আমার দিকে তাকাল, ‘সমরেশকাকু, এই গোত্র ব্যাপারটার গল্পটা কী?’
বললাম, ‘প্রথমে হিন্দুদের শ্রেণীবিন্যাস হয়েছিল আট জন ঋষির নাম ধরে। ঋষির সন্তান বা শিষ্যরা তাঁর গোত্রের মানুষ বলে চিহ্নিত হয়েছেন।
কত জন ঋষি?’ মউলি জিজ্ঞাসা করল।

আট জন। এঁরা ছিলেন প্রবর্তক ঋষি। এঁদের নাম ভরদ্বাজ, জমদগ্নি, কশ্যপ, বশিষ্ঠ, অগস্ত্য, অত্রি, বিশ্বামিত্র এবং গৌতম। পরে আরও কিছু নাম সংযোজিত হয়েছে।

বাবা বলেছে আমাদের গোত্র ভরদ্বাজ, তার মানে তাঁর থেকেই আমাদের শুরু।’ ‘প্রচলিত ধারণা তাই। ধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণদের গোত্র নিয়েই বেশি বলা হয়েছে। ক্ষত্রিয়, কায়স্থদের গোত্র নির্ধারিত হয়েছে তাঁদের কুলগুরুর গোত্র থেকে।বললাম।

ঠিক এই মুহূর্তে পশ্চিমবাংলায় ভরদ্বাজ গোত্রের মানুষ জন আছেন?’
বললাম, ‘বলতে পারব না রে। গোত্র নিয়ে কাউকে কথা বলতে শুনি না।
কোথাও কি লেখা আছে যে, এক গোত্রের মধ্যে বিয়ে হবে না?’ প্রশ্ন করল মউলি।
প্রচলিত মত তাই।
কেন? হবে না কেন?’
উত্তরটা দিল আরতি, ‘কারণ শরীরে একই রক্ত বইছে। ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হয় না।
আচ্ছা। সমরেশকাকু, এই ভরদ্বাজ ঋষি কবে জন্মেছিলেন?’
বললাম, ‘উনি বৃহস্পতির ছেলে। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে সত্যযুগে।
ওঁর মায়ের নাম?’
ওঁর ঠিক মা নেই। মানে, উনি মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণ করেননি।
মাই গড!’ চোখ কপালে উঠল মউলির, তা হলে?’
পুরাকালে ওসব হত। যজ্ঞের পায়েস খেয়ে দশরথের রানিরা মা হয়েছিলেন।
ভরদ্বাজের তো মা ছিলেন না, তা হলে তিনি কী করে জন্মেছিলেন?’

মউলির দিকে তাকালাম, ‘উতথ্য ঋষির ভাই বৃহস্পতি এক দিন তাঁর বউদি মমতাকে একা পেয়ে কামনা করলেন। মমতা রাজি না হওয়ায় তিনি বলপ্রয়োগ করতে চাইলে মমতার গর্ভের শিশু বাধা দেয়। তাতে বৃহস্পতি শিশুকে অন্ধ হওয়ার অভিশাপ দেন। কামনার কারণে বৃহস্পতির শরীর থেকে একটি শিশুর জন্ম হয়, যার দায়িত্ব মমতা নিতে চাননি, বৃহস্পতিও না। তখন দিতির সন্তান মরুদ্রা এসে শিশুটিকে পালন করে। মরুদ্দের দ্বারা ভৃত হয়েছিলেন বলেভরআর সংকর বলেদ্বাজবলা হল। দুইয়ে মিলে ভরদ্বাজ।

সর্বনাশ। তা হলে তো ভরদ্বাজ একটি বাস্টার্ড।
আরতি চিকার করল, ‘মউলি?’
মউলি বলল, ‘ঠাণ্ডা মাথায় ভাবো। যার মা নেই, বাবার লাম্পট্যের কারণে যার জন্ম, সে কি স্বাভাবিক? সমরেশকাকু, ভদ্রলোক কত বছর আগে পৃথিবীতে ছিলেন?’

এই তো মুশকিলে ফেললে! সত্য, দ্বাপর, ত্রেতা এবং কলিএই হল চার যুগ। কলিযুগ শুরু হয়েছে খ্রিস্ট পূর্বাব্দ তিন হাজার একশো এক-এ। তার মানে কলির বয়স এখন পাঁচ হাজার। ত্রেতার কাল যা লেখা আছে, তা হল বারো লক্ষ পঁচানব্বই হাজার বছর, দ্বাপরের বয়স আট লক্ষ পঁচাশি হাজার বছর। বৃহস্পতি যদি সত্যযুগের হন, তা হলে ভরদ্বাজও তাই হলে মিনিমাম একুশ লক্ষ পঁচাশি হাজার বছর আগে ধরে নিতে পারো।বলতে বলতে নিজেই ধন্দে পড়লাম।

মউলি হাসল, ‘এই এত লক্ষ বছর ধরে প্রতিটি বাবা তাঁর ছেলেদের বলে গেছেন যে, তাঁর গোত্র কী এবং সেটা ছেলেরা তাঁদের সন্তানদের বলেছে? এই ভাবে রিলে হয়ে বাবার কাছে পৌঁছে গেছে? তুমি বিশ্বাস কর?’

না। করি না।মাথা নাড়লাম আমি।
পরমব্রত এবং আরতি আমার দিকে তাকাল।

বললাম, ‘যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুর সময় বাঙালি বলে কোনও জাতি ছিল না। ভাষা তো দূরের কথা, এই এলাকার মানুষ, মুনি ঋষিদের নাম দূরের কথা সব ভগবানের অস্তিত্ব জানত কি না সন্দেহের।
মউলি খুব খুশি হল, ‘বাবা, তোমার বক্তব্য কী?’

পরমব্রত বলল, ‘আমি ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই। হয়তো আমরা পরে আবিষ্কার করেছি। কিন্তু, গোত্রের প্রয়োজন হয়েছিল মানুষের পরিচয়ের জন্যে, তা তো ভুল নয়।

মউলি আমার দিকে তাকাল, ‘তা হলে ঋষি কেন? তখন তো দেবতারা প্রায়ই পৃথিবীতে আসতেন। অপ্সরা এসে মুনিদের ধ্যান ভাঙাত। তা হলে হিন্দুদের গোত্রের জনক দেবতারা হলেন না কেন? ওঁরা তো সুপার পাওয়ার।

কারণ, প্রজাপতি ব্রহ্মা, যিনি ত্রিলোক সৃষ্টি করেছেন, তিনিই মানুষের স্রষ্টা। ব্রহ্মা আট জন প্রবর্তক ঋষির ওপর মানবজীবন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন।
আচ্ছা, সমরেশকাকু, যে লোকটা তখন নরওয়ে বা চিলিতে জন্মেছিল, তার সম্পর্কে ব্রহ্মার কোনও দায়িত্ব ছিল না?’ মউলি হাসল।
পরমব্রত বিরক্ত হল, ‘ঠাট্টা করছ? পৃথিবীর সব ধর্মেরই নিজস্ব ইতিহাস আছে।

আগে তো মানুষ সৃষ্টি হয়েছিল, তার অনেক পরে ধর্ম।মউলি জোর গলায় বলল।আচ্ছা, সমরেশকাকু, ভরদ্বাজ ঋষির কথা তো শুনলাম। অন্য সাত জনের সম্পর্কে কি কিছু বলবে?’
দ্যাখো, এঁরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত জ্ঞানী এবং অসম্ভব ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। কশ্যপকে বলা হয় ব্রহ্মার মানসপুত্র। ওঁর স্ত্রীরা সবাই জগপ্রসবিনী। যেমন, অদিতি হলেন দেবতাদের মা, দিতি দৈত্যদের, ইলা হলেন বৃক্ষ বা উদ্ভিদের জননী। জমদগ্নি ঋষিকে বলা হয়েছে চার বেদের ওপর অসাধারণ জ্ঞানী। ঋষি গৌতম ছিলেন মানুষের আচার এবং রীতিনীতি বিষয়ক সংহিতাকার। ঋষি অত্রি ঋগ্বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা, অথর্ব বেদে এঁর ভূমিকা প্রবল। ব্রহ্মা প্রথমে যে সপ্তর্ষিকে সৃষ্টি করেন, অত্রি তাঁদের অন্যতম।

বাব্বা! ঠিক আছে আর শুনতে চাই না। বাবা, তুমি তোমার জন পূর্ব পুরুষের নাম জানো? মা, তুমিও বল?’ মউলি বিষয় ঘোরাল।
পরমব্রত
বলল, ‘আমি বাবার ঠাকুরদার নাম জানি।

অর্থাৎ, তোমার আগের তিন পুরুষ। ম্যাক্সিমাম একশো বছর। অথচ, দাবি করছ, একুশ লক্ষ বছর আগে যিনি তোমাদের প্রথম পুরুষ, তাঁর নাম জানো। নিজেকেই প্রশ্ন কর না? বিশ্বাস করছ?’ মউলি বলল।

আরতি
উঠে দাঁড়াল, ‘ সব প্রশ্ন আমি কখনও করিনি।
ভাবোনি, তাই করোনি। তোমার মায়ের দিদিমার নাম তুমি জানো, মা?’
না।
তা হলে বোসো।

বললাম
, ‘মউলি অত লক্ষ বছর ধরে আমরা কেউ গোত্র-পিতার নাম মনে করে রাখিনি। বড় জোর চার-পাঁচশো বছর আগে প্রতিটি পরিবারের কুলগুরুর নির্দেশে আমরা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি। অর্থাৎ, সেই কুলগুরু যে ঋষিকে গুরু বলে মেনেছেন, তাঁর নামে আমাদের গোত্র হয়েছে।

মউলি
হাসল, ‘সব কুলগুরু যদি এক জনকেই গুরু বলে স্বীকার করতেন, তা হলে সমস্ত বাঙালির গোত্র এক হয়ে যেত? বিয়ে হত না?’
আরতি
বলল, ‘তা কেন হবে? আট জনের আট রকম ধারা।

শেষ কথা বলছি। বাবা, পৃথিবীর প্রথম পুরুষ আদম, প্রথম নারী ইভ। আমরা সবাই তাদের বংশধর। তা হলে তো মায়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক ভাইবোনের। তাই না?’ মউলি বলল।
আরতি
উঠে গেল। পরমব্রত মাথা নাড়ল, ‘কত কাল আগে কী হয়েছিল—’

একুশ লক্ষ বছর কি এই সেদিনের কথা?’ মউলি জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু একটা ইন্টারেস্টিং মিল দেখতে পাচ্ছি, সমরেশকাকু। তুমি আট জন ঋষির নাম বললে, যাঁরা গোত্রের জনক। মানুষের শরীরে যে রক্ত বইছে, তাও কিন্তু আট ভাগে ভাগ করা হয়েছে। , বি, এবি, এবং ও। প্লাস এবং মাইনাস। বাবার যে গোত্র, তা ছেলেদের মানতে হচ্ছে, কিন্তু বাবার যা ব্লাড গ্রুপ, তা সব ছেলের নাও হতে পারে। আর, একই ব্লাড গ্রুপ হলেও দুজন মানুষের বিয়েতে কোনও সমস্যা নেই।মউলি সোজা হল, ‘বাবা, কোনও কিছু মানছ না, হঠানিজেকে হিন্দু মনে করে গোত্র টেনে আনছ, এটা কিন্তু সমর্থনযোগ্য নয়। বরং আমি আর অর্ণব রক্ত পরীক্ষা করাব। দেখব, সব ঠিকঠাক আছে কি না।মউলি চলে যেতে দাঁড়াল, ‘যদি গোত্রের নাম বলতে হয়, তা হলে বলব আমার গোত্র হল পরমব্রত-আরতি।সে চলে গেল।

পরমব্রত
অসহায় চোখে তাকাল, ‘তুই ভরদ্বাজ মুনি সম্পর্কে যা বললি, তা সত্যি?’
বললাম
, ‘রেখেঢেকে বলেছি। মমতা ছিলেন বৃহস্পতির বউদি। বউদি গর্ভিনী জেনেও তাঁকে একা পেয়ে বৃহস্পতি সঙ্গম করতে চান। মমতা আপত্তি করলে বলপ্রয়োগ করেন। তখন মমতার গর্ভের শিশু দুই পায়ে কাকার অপচেষ্টাকে বাধা দেয়। ফলে, বৃহস্পতির অভিশাপে সে অন্ধ হয়ে যায়। মমতার শরীরে না পৌঁছে বৃহস্পতির বীর্য মাটিতে পড়ে এবং একটি শিশু জন্ম নেয়। বৃহস্পতি মমতাকে সেই দ্বিতীয় শিশুর মা হতে বললে তিনি রাজি হন না। পরে সেই সন্তানই ভরদ্বাজ মুনি হিসেবে পরিচিত হন।

তার পর?’
মানুষের রোগ দূর করার জন্যে ইনি ইন্দ্রের কাছে গিয়ে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র পাঠ করেন। ফিরে এসে মর্তের ঋষিদের আয়ুর্বেদ শিক্ষা দেন। মহাভারতে দেখা গেছে এঁর আবাস হরিদ্বারে। রামায়ণেও এঁকে পাওয়া গিয়েছে। ভরতের জন্যে ইনি মরুস্তোম যজ্ঞ করে তাঁকে পুত্র দান করেন। তবে, তখনকার দিনে যেমন হত, তার বাইরে তিনি যাননি। গঙ্গায় ঘৃতাচী নামে এক অপ্সরাকে স্নান করতে দেখে ভরদ্বাজের শুক্রপাত হয়। তা থেকে জন্ম হয় দ্রোণের। ভরদ্বাজের ছেলে যবক্রীত রৈভ্যের পুত্রবধূকে ধর্ষণ করায় রৈভ্য তাঁকে হত্যা করেন। কিছু না জেনে ভরদ্বাজ তাঁকে অভিশাপ দেন যে, তিনি বিনা অপরাধে ছেলের হাতে মারা যাবেন পরে ভুল বুঝতে পেরে আগুনে আত্মাহুতি দেন। দ্যাখো, সব কাহিনির সত্যতা কে বিচার করবে? পৌরাণিক প্রায় সব চরিত্রই আজকের নিরিখে চরিত্রহীন।

মুখ
নিচু করে বসেছিল পরমব্রত। তার পর বলল, ‘এই সব বন্ধ করা উচিত।
তা হলে মউলি ঠিক?’

জানি না। আমরা ওকে যে ভাবে বড় করেছি, আজ নতুন করে তার বিপরীত ভাবনা চাপিয়ে দিলে মানবে কেন? আসলে আমার বাবা, ঠাকুরদা যা বলতেন তা মেনে নিয়েছি, প্রশ্ন মনে এলেও মুখে কখনও বলিনি।পরমব্রতকে অন্য রকম দেখাল।

বললাম
, ‘অনেক ধন্যবাদ। পুরীর মন্দিরে গিয়েছিস? মন্দিরের বাইরে অনেক মিথুন মূর্তি, ভেতরে জগন্নাথ। আমাদের পৌরাণিক কাহিনিগুলো যদি উপদেশে ভরা থাকত, তা হলে লোকে শুনত না, পরে পড়ত না। এগুলো থেকেই বোঝা যায়, সে সময়ের মানুষের রুচি কী রকম ছিল। তাদের পড়াবার জন্যে কথায় কথায় যৌন-মিলনের গল্প তৈরি করতে হয়েছে। হয়তো আসল ভরদ্বাজ মুনির সঙ্গে এই কাহিনির কোনও মিল নেই।

তা হোক। কী হবে সেই অতীতকে টেনে, যার সঙ্গে আমাদের জীবনযাপনের কোনও সম্পর্ক নেই। মেয়ে আমার চোখ খুলে দিল, সমরেশ। ওর গোত্র যদি পরমব্রত-আরতি হয়, তা হলে আমার গোত্র দেবব্রত-কমলা।পরমব্রত হাসল।

বাঃ।উঠে দাঁড়ালাম, ‘পরমব্রত, এত কাল মেয়েদের দিয়ে বলানো হয়েছে তোমার গোত্রান্তর হয়ে গেল। যে মা-বাবার জন্যে পৃথিবীতে এসেছ, তুমি তাদের গোত্রের নও। যাকে কোনও দিন চিনতে না, তার সঙ্গে বিয়ে মানে তুমি তার গোত্র পাবে। অনেকটা ক্রীতদাসের মতো ব্যবহার পেয়েছে মেয়েরা। কিন্তু, তোর মেয়ে যখন বলল, ওর গোত্র পরমব্রত-আরতি, তখন আমার মন ভরে গেল। এই প্রজন্মের একটি মেয়ে তার মাকে প্রতিষ্ঠা দিল। সব বন্ধ করার কথা বলছিলি না? বন্ধ নয়, নতুন চেহারায় শুরু হোক না!’

মউলি
এবং অর্ণবের বিয়েতে পুরোহিত বাধ্য হয়েছিলেন দুজনের মা-বাবার নাম ওদের গোত্র হিসেবে উচ্চারণ করতে। না হলে আইনি বিয়ের পর হিন্দুমতে বিয়ে ওরা করত না। অতীত আঁকড়ে থেকে পুরোহিত নিজেকে দক্ষিণা থেকে বঞ্চিত করতে রাজি হননি। মউলিরা চাইছে সবাই তাদের অনুসরণ করুক