আজ আলোচনা করা হবে সুগন্ধি নিয়ে। (দ্রষ্টব্য : এই লেখা কোনোক্রমেই ডাক্তারি কোনো ব্যবস্থাপত্র নয়, সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের উপস্থাপনামাত্র)। আমাদের সমাজে যৌণবিষয়ক আলোচনা যেন ব্রাত্য। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে যৌণ রোগ একটি বড় সমস্যা। এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞানের অভাব দাম্পত্য জীবনে কলহ ডেকে আনতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিবাহ-বিচ্ছেদ পর্যন্ত ঘটাতে পারে। সংসারে নিত্য মন কষাকষিতো আছেই। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌণতার সম্পর্ক স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দুজনের কারো যদি সমস্যা থেকে থাকে সেটার জন্য ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক। অনেকের শারিরীক সমস্যা না থাকলেও এ ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন। ধরুন, আপনি আপনার সঙ্গীর কাছে বসলেন, কিন্তু তার মুখ থেকে রেরিয়ে এলো উৎকট দূর্গন্ধ।
মুহুর্তেই কিন্তু সব ইচ্ছে উবে যাবে। অথচ একটু সচেতন হলে, নিজেকে দূর্গন্ধমুক্ত করে নিলেই কিন্তু ল্যাঠা চুকে যেতো। আর বিশেষ ধরণের সুগন্ধিও কিন্তু এ ক্ষেত্রে তেলেসমাতির মতো কাজে দেয়। মন ফুরফুরে করে। তবে সাবধান, দুর্গন্ধ ঢাকতে যেন সুগন্ধি না মাখেন। খোশবু, ঘ্রাণ, মনোহর আঘ্রাণ, আতর-সেন্ট, পারফিউম, সুগন্ধি- যে নামেই ডাকুন না কেন-মানুষের জীবনে এর বিস্ময়কর ভূমিকা রয়েছে। আমাদের বাহ্যিক জ্ঞান লাভের জন্য পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের (চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা-জিহ্বা ও ত্বক) একটি হলো নাসিকা বা নাক। শ্বাস-প্রশ্বাসের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এটি ঘ্রাণেন্দ্রিয়। এই ইন্দ্রিয় আমাদের শরীরের জন্য উপকারি বিষয়-আশয় নির্ধারণ করতে অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের সহায়ক। মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ পেলে সকল জাতির, সকল বয়সের মানুষের মন আনন্দে নেচে ওঠে! সুগন্ধির মূল রসায়ণ কি আসলে? বা কেন সুগন্ধি আমাদের এতটা মুগ্ধ করে?
সুগন্ধির রসায়ন শুরু হয় আমাদের নাক থেকে, তাই কি? আসলে এর মূল প্রোথিত আরও গভীরে। সুগন্ধিতে উদ্বায়ী পদার্থ ব্যাবহার করা হয় যা ধর্মমতে সাধারণ তাপমাত্রায় দ্রূত উবে যায়, আর তাই সুগন্ধি ব্যাবহারের সাথে সাথে তার গন্ধ ছড়িয়ে পরে এই উদ্বায়ী অনু আমাদের নাকের ভিতর দিয়ে যেয়ে আমাদের গন্ধ সংবেদনশীল কোষে পৌঁছে যায় ও এদের লক্ষ লক্ষ অনু আমাদের কোষের রিসেপটরকে উজ্জীবিত করে মেমরি সেল তৈরি করে। তাই এটা আমাদের স্মৃতিতে জড়িয়ে যায়। আমাদের নাকের রিসেপটর সংখ্যা ১০০ যা আমাদের জিনের ১ %। অথচ চোখের রিসেপটর মাত্র ৩টি। মজার ব্যাপার হলো পারফিউম এ কারণেই আমাদের উজ্জীবিত করে মনে করিয়ে দেয় আমাদের মিলন বা বিচ্ছেদের স্মৃতি, আর এই রসায়নকে কাজে লাগিয়ে সেক্স আ্যাপিল পারফিউমগুলো কাজ করে। প্রাচীন কাল থেকে মানুষ সুগন্ধি ব্যাবহার করে আসছে নিজেদের শরীরের গন্ধ লুকাতে,মানুষের ভিন্ন ভিন্ন রসায়ণের জন্য মানুষভেদে একই সুগন্ধি ভিন্ন ভিন্ন সৌরভ ছড়ায়। পারফিউম শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ পার (মধ্য দিয়ে) আর ফুমুম (ধোয়া) থেকে [per fumum, meaning "through smoke]। প্রাচীন যুগে সুগন্ধি তৈরি হত গাছ গাছড়ার ছাল,বাকল পেষণ ও সিদ্ধ করে। পরবর্তীতে এটা বিভিন্ন নির্যাসের সাথে তেল ও এলকোহলের বিভিন্ন মাত্রায় মিশ্রনের ফলে তৈরি হয়ে থাকে। মিশরীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়-তারাই প্রথম সুগন্ধি নিজেদের ব্যাবহারের জন্য। শুরু করে প্রথম দিকে শুধু মাত্র ধর্মযাজকরাই সুগন্ধি ব্যাবহার করত। এমনকি সুগন্ধি তাদের উপসানালয়তেই তৈরি হত। ধীরে ধীরে তা রাজা ও রাজপরিবারের দখলে চলে আসে। মিশরীয়রা মমি তৈরির সময় বিভিন্নজাতীয় সুগন্ধি মশলা ব্যাবহার করতো। কিন্তু সুগন্ধি জল বা পারফিউম খুব পবিত্র আত্মার সাথেই দেয়া হত। ১৯৯২ সালে যখন তুতেনকখামেনের মমি আবিষ্কার হয় তখন সেখানে সুগন্ধি রাখার পাত্রও পাওয়া যায়। গ্রীস পরবর্তীতে মিশরীয় সুগন্ধিগুলোকে আরও উন্নত করে। তার পরে রোমানরাও সুগন্ধি নিয়ে মেতে উঠে। সুগন্ধির মোট তিনটি নোট থাকে (মানে ব্যবহারের সময়ের সাথে সাথে গন্ধ পরিবর্তন হবার তিনটি পর্যায় থাকে )। * টপ নোট বা নোটস ডি টেট- ইটা ব্যাবহারের সাথে সাথে যা সুগন্ধি ছড়ায় তাকে বলা হয়। আমরা সাধারণত সুগন্ধি কেনার সময় টপ নোট টা দেখেই কিনি। যা তাৎক্ষণিক ঘ্রাণ দেয়। *সেন্ট্রাল, মিডল বা হার্ট নোট- এটা সাধারণত টপ নোট সম্পূর্ন উবে গেলে পাওয়া যায়। এবং অনেকক্ষণ ধরে আমাদের শরীরে থাকে ও টপ নোটের ঝাঝালো গন্ধটিকে স্মিমিত করে। *বেস নোট বা নোট ডি ফন্ড- এটা অনেক দিন যাবৎ থাকতে পারে। দেখা যায় পারফিউম ব্যাবহার করে কোন শার্ট বা শাড়ি উঠিয়ে রাখা হলে অনেক দিন পর খুললে একটা সুগন্ধ পাওয়া যায়। এটাই হলো বেস নোট। সুগন্ধি আজো উপসাগরীয় আরবদের কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতো। বিশেষ কিছু সুগন্ধ, যা ওরিয়েন্টাল খোশবুর অন্তর্ভূক্ত, আরবদের ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। চার-পাঁচ হাজার ডলার দামের এক বোতল আগরকাঠের আতর এই আরবে বিক্রি হয়। শুধু যে আরব শেখরা এতো দামের আতর-খোশবু ব্যবহার করে তা নয়। জাপানের টেম্পলগুলোতে এর চাইতেইও অনেক দামী আগর সুগন্ধ জ্বালানো হয়। Perfume: The Story of a Murderer (film) সম্পর্কে অনেকেই জানেন হয়তো। একটা পারফেক্ট সেন্ট বানানোর জন্য খুনের ঘটনা হয়। অষ্টাদশ শতকের একটি ফরাসি কাহিনী অবলম্বনে। লোমহর্ষক ট্রাজেডি অথচ অসাধারণ এক সুগন্ধ তৈরির গল্প! এরপরও বলব, সুগন্ধি নিয়ে কম-ই বলা হলো। আরবের বাজারে সোনার চাইতেও অনেক গুণ বেশি দাম সুগন্ধের। উপসাগরীয় আরব কনের জন্য বরপক্ষকে দিতে হয় বিশেষ সুগন্ধি বা এর মূল্য। এই সুগন্ধিতে থাকবে আতর (অয়েল), সেন্ট (স্প্রে) নানা প্রকার এবং বুখুর বা জ্বালাবার সুগন্ধি। সুদান ও সোমালিয়ার নববধুদের জন্য তো খোশবু একেবারে মাথা খারাপ অবস্থা! গরীব এই দেশ দু’টির সংস্কৃতিতে এতো দামি সুগন্ধ কনেদের জন্য রীতিমতো ঘোড়া রোগ! এই যে সুগন্ধি নিয়ে এতো মাতামাতি এর নেপথ্যেই কিন্তু এর উপযোগিতাটা প্রমাণ করে। সুগন্ধি কি শুধু মন প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়? জৈবিক তাড়না ফিরিয়ে আনে? এর রয়েছে হরেক গুণ। মানুষের শরীরেরও ঘ্রাণ আছে, ভিন্ন ভিন্ন। সম্ভবত এই ভিন্নতা খাদ্যাভ্যাস ও জেনেটিক কারণে। একটা পিউর ফ্রেগরেন্স শরীরে লাগালে পরে শরীরের খুশবোর সাথে মিশে একেকজনের শরীর থেকে আলাদা আলাদা ঘ্রাণ আসে। তাছাড়া ছোট্ট শিশুদের মুখমণ্ডলে থেকে প্রাকৃতিকভাবে কি মধুর খুশবো বের হয়! একটি ফ্রেঞ্চ পারফিউমে একেবারে ওই বাচ্চাদের খুশবোর মতো ঘ্রাণ বেরোয়। সম্প্রতি জার্মান গবেষকদের গবেষণার জানা যায়, দুর্গন্ধ হতাশার সৃষ্টি করে। হতাশ মানুষ কোন কাজেই আনন্দ পায় না এবং সব কাজই তাদের কাছে বোঝা মনে হয়। তাই কাজে উদ্যমী হতে হলে, মুড ভাল রাখতে হলে সুগন্ধির ব্যবহার অনিবার্য। সেটা দাম্পত্য জীবনে হোক আর কর্মস্থলে হোক। লেখা বড় হয়ে গেল। যাওয়ার আগে ছোট্ট একটি সত্যি গল্প দিয়ে শেষ করছি। সালটা ১৯৫৪। হলিউড কুইন মেরিলিন মনরো তখন যুবকদের স্বপ্নসুন্দরী। মিডিয়ার আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই তার ব্যাপারে অতিমাত্রায়। অনেক স্টাডি-ফাডি করে এক ‘সাহসী’ সাংবাদিক গেছেন তার সাক্ষাৎকার নিতে। মনরোকে ওই সাংবাদিকের প্রথম প্রশ্নটা ছিল, ”আচ্ছা, রাতে আপনি কি পড়ে ঘুমাতে যান।” (সাংবাদিক ভেবেছিলেন আচ্ছা একটা প্রশ্ন করা গেছে।) কিন্তু মনরোর সাবলীল জবাবটা ছিল: ”ফাইভ ড্রপস অব শ্যানেল নাম্বার ফাইভ।” এরপরই ফরাসি এই পারফিউমটি নিয়ে মহাতুলকালাম পড়ে যায় গোটা বিশ্বে।